ভ্রমণের নেশায় ঘর ছেড়ে দূর দূরান্তে বের হলেও একসময় মাথা গোঁজার একটা ঠাঁইয়ের প্রয়োজন হয়। আর ঘরের বাইরে স্বল্প সময়ের জন্য থাকার ঠিকানা হলো আধুনিক যুগের হোটেল, ইন, মোটেল, ব্যকপ্যাক হোস্টেল ইত্যাদি। কিন্তু গাটের পয়সা খরচ করে হোটেলে থাকছেন বলে নিজের বাড়ির মতো যেমন ইচ্ছে তেমন আচরণ করা যাবেনা। হোটেলে থাকার কিছু সভ্য আদবকেতা রয়েছে। হোটেল এটিকেট জানা ও মান্য করা মানুষের রুচির পরিচয় দেয় তাই চলুন জেনে নেই হোটেলে কি কি করা যাবে আর কি কি যাবেনা।
১। সততা বজায় রাখা: দুইজন মানুষের জন্য ডাবল বেডের রুম বুক করে সেখানে ৮ জনের পরিবার নিয়ে উঠবেন না। হোটেলের রুম বুক করবার সময় বা পরে রিসিপশনে সবসময় সৎ থাকুন। কোন কারণে ভ্রমণে সঙ্গীর সংখ্যা বেড়ে গেলে তা চেক ইনের সময় আগে থেকেই হোটেলের রিসেপশনে জানান।
২। হট্টগোল কে না বলুন: যখন কোন হোটেলে থাকছেন তখন মনে রাখবেন আপনার আশেপাশের রুমে অনেক মানুষ আছে যারা নানা কাজে একই জায়গায় আছেন এবং সবার প্রাইভেসি রক্ষার অধিকার আছে। তাই নিজের আড্ডার আনন্দ বা ছুটির মজার প্রকাশ সীমিত রাখুন এবং হোটেলের রুমে, করিডোরে হট্টগোল করা থেকে বিরত থাকুন।
৩। পরিচ্ছনতা বজায় রাখুন: প্রায় সমস্ত হোটেলই হাউজকিপিংয়ের সার্ভিস দেয় তারমানে এই নয় যে আপনি ইচ্ছেমতো রুম অগোছালো করে বা ময়লা করে তাদের সার্ভিসের সুবিধা নিবেন। পাব্লিক প্রপার্টির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে হোটেল রুম নিজে যতটা সম্ভব পরিষ্কার রাখুন। রুমের যত্রতত্র ময়লা না ফেলে ট্র্যাশ ক্যান ব্যবহার করুন, ভেজা তোয়ালে বা গ্লাস আসবাবপত্রের উপর না রেখে ট্রে বা র্যাকে রাখুন। এ সমস্ত ছোট ছোট কাজ দিন শেষে বাইরের মানুষের কাছে আপনার রুচির পরিচয় দিবে।
৪। পরিবেশবান্ধব অভ্যাস গড়ে তুলুন: টাকা দিয়ে থাকছেন বলে হোটেলের ইলেক্ট্রিসিটি, গ্যাস অন্যান্য ইউটিলিটি আজেবাজে ভাবে খরচ না করে নিজের পরিবেশ ও ভবিষ্যতের কথা ভাবুন। সকালে রুম থেকে সারাদিনের জন্য বের হবার সময় অবশ্যই মনে করে রুমের লাইট, ফ্যান, এসি, টিভি, হেয়ার ড্রায়ার ইত্যাদি যন্ত্রের মেইন সুইচ বন্ধ করে যান। এতে অযথা বিদ্যুৎ অপচয় রোধ হবার সাথে সাথে পরিবেশ দূষিত কম হবে।
৫। বুফে ব্রেকফাস্ট খাবার নষ্ট করবার জায়গা নয়: আজকাল অনেক হোটেলে সকালে বুফে নাস্তার ব্যবস্থা থাকে। নানারকম খাবার আয়োজন দেখে চোখ ও মনের তৃপ্তির জন্য আমরা অনেক সময় নিজের ধারণ ক্ষমতার বেশি খাবার প্লেটে তুলে নেই এবং অধিকাংশ খাবার খেতে পেরে নষ্ট করি। ভদ্রতা বজায় রেখে যতটুকু খেতে পারবেন ততটুকু খাবার প্লেটে নিন। খাবার নষ্ট করা মানে আপনি কোন না কোন ভাবে আরেকজনের মুখের খাবার কেড়ে আস্তাকুড়ে ফেলছেন।
৬। সময়কে অনুসরণ করুন: প্রতিটা হোটেলের চেক ইন, চেক আউট, ডাইনিং ইত্যাদির জন্য নিজস্ব সময় রয়েছে। গেস্ট হিসেবে এসমস্ত নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা জরুরী। চেক আউটের দেরি হলে বা চেক ইনের নির্ধারিত সময়ের আগেই আপনি রুমে যেতে চাইলে হোটেল রিসেপশনে সে বেপারে কথা বলে ঠিক করে নিন। আবার সব হোটেলে খাবার পরিবেশনের নির্ধারিত সময় থাকে, তার আগে বা পরে ডাইনিংয়ে গিয়ে খাবারের আশা না করে তাদের রুটিন অনুযায়ী নিজের দিনের প্ল্যান করুন।
আরও পড়ুনঃ দেশের সকল ফাইভ স্টার হোটেল
৭। রুম সার্ভিস: বাড়ি এবং হোটেলের পার্থক্য হলো দৈনন্দিন কাজ করবার জন্য এখানে আলাদা লোক ও সার্ভিস রয়েছে। কিন্তু তাই বলে মধ্যরাত বা ভোরবেলায় রুম/লন্ড্রি সার্ভিসের আশা করবেন না। রিসেপশনে কথা বলে রুম সার্ভিসের সময় জেনে নিন। নির্ধারিত রুম সার্ভিসের বাইরে বিশেষ কোন সেবা সময়ে অসময়ে দাবি না করা ভাল। হোটেল রুলস মেনে চলুন। নিজের পছন্দ মতো সেবা নিতে হোটেল স্টাফদেরকে ঘুষ প্রদান করতে যাবেন না। এতে নিজের সম্মান ও হোটেল স্টাফের চাকরিকে আপনি হুমকির মধ্যে ফেলছেন।
৮। শিশুদের সামলে রাখুন: হোটেলে বেবি কেয়ার সার্ভিস বা ন্যানি সেবা না থাকলে আপনার শিশুদের সামলে রাখবার দায়িত্ব একান্তই আপনার। শিশুরা স্বাভাবিক ভাবেই চঞ্চল হয় এবং এরা হৈচৈ ও কোলাহল পছন্দ করে। তাদের চঞ্চলতার ভিড়ে তারা যেন হোটেলের জিনিসপত্র নষ্ট না করতে পারে অথবা কোন দুর্ঘটনা না ঘটে সে খেয়াল রাখুন। এছাড়া আপনার শিশুর জন্য যেন হোটেলের অন্য গেস্টদের সমস্যা না হয় সেটা নিশ্চিত করাও ভদ্রতার পরিচয়।
৯। ধন্যবাদ দিতে ভুলবেন না: আমাদের দেশে ছোটকাল থেকে যে জিনিসটা সব থেকে কম শেখানো হয় তা হলো অন্যকে ধন্যবাদ জানানো। ছোট্ট এই শব্দটি দিন শেষে অন্য আরেকজনের মন ভাল করে দিতে পারে। চেক আউটের সময় অবশ্যই হোটেল স্টাফদের ধন্যবাদ জানান। মনে রাখবেন তারা আপনার ভ্রমণকে আরামদায়ক করবার জন্য তাদের সবটুকু দিয়ে কাজ করছে। হোটেলের ফিডব্যাক নোটে আপনার ভাল লাগা, মন্দ লাগার বিষয়গুলো অল্প কথায় লিখে আসলে ভবিষ্যৎ তাদের সেবার মান বৃদ্ধিতে ভীষণ কাজে দিবে। প্রয়োজনে চেক আউটের সময় হোটেল স্টাফদের কিছু টিপসও দিতে পারেন। সর্বোপরি হোটেলের সেবা ভাল লাগলে তার কথা গল্পে কিংবা সামাজিক মাধ্যমে সবাইকে জানাতে পারেন। আপনার এই ছোট্ট কাজ হয়তো একটা কমিউনিটিকে এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে।
জীবনের নানা ধাপে রুচি ও শিক্ষার এক অনন্যতার পরিচয় এই সমস্ত ছোট ছোট কাজের মাধ্যমে দেওয়া সম্ভব। এসকল আদবকেতা যেমন নিজেকে সমৃদ্ধ করে তেমনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে দায়বদ্ধতা থেকে মুক্তি দেয়।